আর্তনাদ

বাবা, আমরা কি এবারেও গ্রামে গিয়ে ঈদ করবো না? গত ঈদেও তো গ্রামে যাই নিই। সিব্বির চুপ করে মাথা নিচু করে আছে। সিব্বির মাথা তুলে আদরের কন্যার সামনে চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস নেই। নিজের আবেগকে কাবু করতে পারবে না। তাই সে মাথা নিচু করেই ছিল। বাবারা কেন জানি সন্তানের প্রতি তাদের ভালবাসাকে সব সময় গোপন রাখতেই পছন্দ করে। গোপনে গোপনে সন্তানদের জন্য কাঁদলেও সামনা সামনি কঠোরতা দেখায় বেশি। আমার লক্ষীটা, আমরাও তো যেতে চাই কিন্তু এই লক ডাউনে কিভাবে বাসায় যাবে বল? সব গাড়িই তো বন্ধ কিভাবে যাবে? মায়ের কথা শুনে সাদিয়ার মন খারাপ হয়ে গেলো। সিব্বিরের স্ত্রী নাফিসা মেয়েকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে যদিও বা সন্তুষ্ট করাতে পারে নিই।

সিব্বির আর নাফিসা হাই স্কুলের গন্ডি পার করে কলেজে পড়াকালিন অবস্থায় দুজনে ভালোবেসে বিয়ে করে ফেলে। এ কারনেই পরিবার তাদের মেনে নেয় নিই। অনেকদিন পর মেনে নিয়েছিল। দুজনে প্রেমের জজবায় ঢাকা চলে আসে। গার্মেনটসে কাজ করে সংসার চালাচ্ছিল। তাদের সন্তান হচ্ছিল না। একজন নারী মা হতে না পারাটা যে কতটা দূর্ভাগ্যের সেটা একমাত্র সেই নারীই জানে। এই যন্ত্রণা তাদের দুজনকেই কুরে কুরে খাচ্ছিল। অনেক দোয়া তাবিজ ডাক্তার দেখানোর পর একটা কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়। তাদের ঘরে আলোর দেখি মিলে। অর্থনৈতিক সমস্যা থাকলেও সন্তান হওয়ার সুখে সব দুঃখ ম্লান হয়ে যায়।

নাফিসা সন্তান জন্ম দেওয়ার পর থেকে চাকরী ছেড়ে দেয়। গার্মেন্টস শ্রমিক সিব্বিরের একক সল্প আয়ের মধ্যে দিয়েই সংসার চলছিল। কিন্তু গত চার মাস হতে সিব্বিরদের বেতন দেয় নিই গার্মেনটস মালিক। আর এই কারনেই গত ঈদুল ফির ঈদে অনেকদিন পর বাসায় গিয়ে ঈদ করার কথা ছিল সেটা করতে পারে নিই। করোনার সময় কষ্ট নষ্ট করে বাসায় গেলেও সঠিক সময়ে ফিরতে অঁআ পারলে চাকরী চলে যাবে। বকেয়া দুই মাসের টাকাও পাওয়া যাবে না। তাই ঈদুল আযহা তে বাসায় গিয়ে বাবার সাথে কুরবানী দিবে সিব্বির।

কুরবানী ঈদ ও চলে আসলো চার মাস হয়ে গেলো সিব্বিরদের এখনো বেতন ভাতা কিছুই দিল না। এদিকে চার মাসের বেতন না পেয়ে শ্রমিকদের অবস্থা করুণ। ঈদে এক কেজি গরুর মাংস কিনে খাওয়ার ও সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে।

অবশেষে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে বেতন ভাতা জন্য আন্দোলনে নামে। গার্মেনটসের মূল ফটকে অবরোধ করে। রাস্তা অবরোধ করে সব যানবাহন আটকে রাখা হয়। আর এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন সিব্বির। টানা তিনদিনের আন্দোলনের ফলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে গার্মেন্টস মালিক বেঠকের সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই মাসের বেতন দিতে রাজি হয়। সাথে শ্রমিকদের কাজে ফিরতে অনুরোধ করে।

চারদিন পর নাফিসা তার মেয়েকে খাওয়াতে খাওয়াতে টি দেকছিল। হঠাৎ করেই টিভিতে ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছিল সিব্বিরের গার্মেন্টসে ভয়াবহ আগুন। আগুন নেভাতে ১১ টি ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট কাছ করছে।

নাফিসা দিশেহারা হয়ে তারাহুরা করেই বার হয়ে আসে। অটো সিএনজি না পেয়ে মেয়েকে কুলে নিয়েই পাগলের দৌড় দিতে থাকে। ঘটনাস্থলে পৌছে আহত ব্যক্তিদের মধ্যে একটা একটা খুঁজে দেখে নাফিসার প্রানের সিব্বিরকে। কিন্তু কোথাও সিব্বিরকে না পেয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকতে নাফিসা আর তার মেয়ে। আত্মীয়স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাশ ভারী হয়ে যায়।

সিব্বিরের লাশ টুকুও আর খুঁজে পাওয়া যায় নিই। হয়তো আগুনে পুরে ছাই হয়ে গেছে। নায্য দাবী নিয়ে আন্দোলন করাটাই হয়তো তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো। বাবার সাথে সিব্বিরের ঈদ করার আশাটা আশায় থেকে গেলো। নাফিসা ও তার মেয়ের গ্রামের।বাসায় গিয়ে ঈদ করার স্বপ্নটা দূঃস্বপ্নে রূপান্তরিত হবে কে জানে।

হয়তো নাফিসা আর তার সন্তানের করুন পরিনতি অপেক্ষা করছে। হয়তো নাফিসা এখন মানুষের বাসায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করবে। হয়তো নাফিসা মেয়ে ঢাকা শহরে ফুল বিক্রেতা হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে।

image-258508-1625811192.jpg

Source



0
0
0.000
1 comments