শেয়ার ব্যবসা এবং বেগুনের গুনাগুন || গোপালের অর্থশাস্ত্র (পর্ব ০২)

in BDCommunity6 months ago

গোপাল ভাঁড়কে আমরা সবাই চিনি। মজার মজার কথা বলে লোক হাসানো এবং প্রচন্ড উপস্থিত বুদ্ধিমত্তার কারণে গোপাল ভাঁড় একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় চরিত্র। গোপাল ভাঁড়ের হাসির আড়ালে থাকে গভীর জীবনবোধ, সমাজ সচেতনতা এবং গভীর জ্ঞানের ইঙ্গিত। আজকের সেরকমই একটা ঘটনাকে সমকালীন অর্থনীতির আলোকে বিশ্লেষণ করবো।

images (11).jpeg


বেগুনের গুনাগুন


একবার রাজার বেগুন তরকারি খেয়ে খুব ভালো লাগলো। তাই তিনি দরবারে এসে বেগুনের খুব গুনগান করলেন।

সঙ্গে সঙ্গে গোপাল লাফিয়ে উঠে বলল, সত্য বলেছেন রাজামশাই। যার আছে ব্যাপক গুন তার নাম বেগুন। বেগুনের গুণের কথা তো বলে শেষ করা যাবে না। বেগুন খেলে চামড়া টানটান হয়। পেট পরিষ্কার হয়। খুবই ভালো একটা তরকারি।

রাজা শুনে খুব খুশি হলেন। পরেরদিন বেশি করে বেগুন তরকারি খেয়ে তার পেট খারাপ হয়ে গেল। শরীর চুলকাতে শুরু করল।

images (13).jpeg

রাজা দরবারে এসে বেগুনের বদনাম করতে শুরু করলেন। সঙ্গে সঙ্গে গোপাল লাফিয়ে উঠে বলল, ঠিক বলেছেন রাজামশাই। যার নেই কোন গুন, নাম তার বেগুন। বেগুন খেলে পেট খারাপ হয়। শরীর চুলকায়। একদম বাজে একটা তরকারি।

রাজা বললেন, গোপাল। কালকেই না তুমি বেগুনের প্রশংসা করেছিলে?

গোপাল সঙ্গে সঙ্গে হাত কচলাতে কচলাতে বলল, রাজামশাই। আমি হলাম ঢাকের কাঠি। বায়েন যেভাবে বাজায়, আমি সেভাবেই বাজি। আপনি গতকাল বেগুনের প্রশংসা করেছেন, তাই আমি প্রশংসা না করে পারিনি। আজ আপনি যখন বেগুনের দুর্নাম করা শুরু করলেন, আমি না করলে বেয়াদবি হয়ে যায় না?

images (15).jpeg

রাজার ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত হয়ে বললেন, তুমি তৈলমর্দনকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছ, গোপাল।


শেয়ার মার্কেট প্রসঙ্গ


এবার আসি আমাদের মূল প্রসঙ্গে। আমাদের দেশে অনেকেই না বুঝে শেয়ার ব্যবসায় নামে। না বুঝে শেয়ার ব্যবসায় নামা অনেকটা গোপালের ঢাকের কাঠির মতন।

বাজারে একটি শেয়ার দাম কেন বাড়ে-কমে, তার সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ থাকে। একটা শেয়ার দাম কখন বৃদ্ধি পাবে, কত টাকা পর্যন্ত বাড়বে এবং কোন গতিতে বাড়বে; অথবা কোন শেয়ারের দাম কখন কমবে, কত টাকা পর্যন্ত কমবে এবং কোন গতিতে কমবে; তার পেছনে ফিন্যান্স, ইকোনমিক্স ইত্যাদির কিছু সুনির্দিষ্ট থিওরি এবং কার্যকরণ কাজ করে।

অথচ দেখা যায়- আমাদের দেশে কিছু মানুষ বুঝে, না বুঝে শেয়ার মার্কেটে টাকা বিনিয়োগ করে। তারা অনেকটা গোপালের মতো। গোপাল যেমন রাজা যা বলে, সেই তালে কথা বলে। তেমনি মার্কেট যেভাবে আচরণ করে, তারা সেভাবে বিনিয়োগ করে।

যখনই কোন শেয়ারের দাম বাড়তে থাকে, তারা হুমরি খেয়ে পরে শেয়ারটি কেনার জন্য। আবার যখন কোন শেয়ারের দাম কমতে শুরু করে, তারা সেটি বিক্রি করতে শুরু করে। কেউ কেউ আরো এক ধাপ এগিয়ে অভিহিত মূল্যের নিচে যেগুলোর বর্তমান বাজার মূল্য, সেগুলো কিনে রাখে। যদি কখনো দাম বেড়ে যায়- এই আশায়।

images (16).jpeg

কিন্তু যেমন একটা সময় যেমন রাজার পেট খারাপ হয়, তেমনি মার্কেটের আচরণও কখনো কখনো পরিবর্তন হয়। যেটাকে আমরা বলি বাজার মন্দা। রাজার পেট খারাপ হওয়ার পরে যেমন গোপালের তোষামোদি ধরা খেয়ে যায়। ঠিক তেমনি বাজারে যখন মন্দা তৈরি হয়, তখন এই ধরনের সিজনাল শেয়ার ব্যবসায়ীরা তাদের মূলধন পর্যন্ত হারায়।

তাই অন্যের কথায় প্ররোচিত না হয় প্রকৃত গুনাগুণ বিচার করা দরকার। কোন শেয়ার ক্রয়ের পূর্বে তার EPS, financial strength, future market expectation, present condition, potentiality annual report ইত্যাদি বিচার-বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

যাদের এগুলো সম্পর্কে ভালো ধারণা নেই- তাদের উচিত অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ নেয়া, নতুবা এই মার্কেট থেকে দূরে থাকা। কারণ শেয়ার মার্কেট হল knowledge-based মার্কেট। অর্থাৎ এই ব্যবসা করতে হলে ফিন্যান্স, ইকোনমি এবং একাউন্টিং-এর কিছু বেসিক আইডিয়া প্রয়োজন।

images (17).jpeg

গোপালের মতো তোষামোদি করে শেয়ার মার্কেটে বেশিদিন খুব ভালো ব্যবসা করা সম্ভব নয়।


সমাপ্ত


অর্থনীতির বিষয়গুলো একটু নিরস। তার উপর আমাদের অনেকেরই অর্থনীতির বেসিক আইডিয়া নেই। ফলে অর্থনৈতিক বিষয়ক লেখা দেখলে আমরা এড়িয়ে যাই। সেজন্য আমি চেষ্টা করছি, অর্থনীতি বিষয়ক কিছু সরস আলোচনা করতে। গল্পের মাধ্যমে কোন কিছু বোঝালে সেটা দীর্ঘদিন মনে থাকে এবং সহজে আয়ত্ত করা যায়।

গোপাল ভাড়ের মজার মজার ঘটনাগুলো সমকালীন অর্থনীতির সাথে লিঙ্ক করে অর্থনীতির বেসিক কিছু আইডিয়া দেওয়াটাই আমার উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে গোপালের অর্থশাস্ত্র ধারাবাহিকটি শুরু করেছি। আজ তার দ্বিতীয় পর্ব ছিল। প্রথম পর্বটি পড়তে পারেন নিচের লিংকে গিয়ে:

ঘুঁটা থিওরী এবং করোনা পরবর্তী দেশের অর্থনীতি

20200627_034755.jpg


আত্মকথনঃ

poster_1593196763985_rd7uzi0du0.gif

আমি ত্বরিকুল ইসলাম। সখের বশে ব্লগিং করি। ব্লকচেইন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি বিষয়ে আগ্রহী।



"পড়াশোনায় ইঞ্জিনিয়ার। পেশায় শিক্ষক। নেশায় লেখক। সাবেক ব্যাংকার। পছন্দ করি লিখতে, পড়তে, ভ্রমণ করতে এবং জমিয়ে আড্ডা দিতে।"


        জীবনটাকে অনেক অনেক ভালোবাসি