যখন চারিদিকে নীরবতা

avatar
(Edited)

একটু প্রশান্তির খোঁজে, কখনো কখনো নিজের অস্তিত্বের সন্ধান নতুন করে খুঁজে পেতে, নিজের ভেতরকার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে বা পুরোন সেই নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে কখনো কখনো নিজের চিরচেনা পরিবেশ থেকে বের হয়ে আসাটাও ভীষণ জরুরি। নতুন করে ভাবতে, নতুন করে নিজেকে খুঁজে পেতে, সেই পুরোনো শৈশবের ভয়ডরহীন সেই নিজেকে খুঁজে পেতে, যা করতে ভালো লাগে তা করতে হলেও সেই শৈশবের নিজসত্ত্বাকে খুঁজে পাওয়া জরুরি। শৈশব সময়টা কেমন যেন একটু অদ্ভুত ছিল, অন্যরকম একটা আবহ চারিদিকে বিরাজ করত। আমরা তখন ছিলাম বেপরোয়া, এই আমার কথাই বলা যাক, সে সময় যা মনে চাইত তাই করতে পারতাম। একদম ভয়ডরহীন একটা আমি ছিলাম তখন। ছুটে চলতাম, বাজ পাখির মতো এক আমি কখনো এদিকে কখনো ওদিকে।

IMG_20220415_050746.jpg

ছিল না হারিয়ে যাওয়ার ভয়, সে এক দুরন্ত আমি। আহা! চিন্তা করলেই অন্তরে প্রশান্তি মিলে। আমার বেড়ে উঠা আর দশটা-পাঁচটা সাধারণ শিশুর মতো নয়, খুবই রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে আমার বেড়ে উঠা। বাবা পেশায় সেনাকর্মকর্তা হওয়ার দরুণ, বাবার সাথে আমার শৈশবটা কেটেছে অত্যন্ত আনন্দঘন মুহুর্তের মধ্যে দিয়ে। কোনো শহরেরই এক কিংবা দুইবছরের বেশি স্থায়ী হতে পারতাম না, তবুও সেসব শহরের প্রতি ছিল আমার অগাধ টান, টান ছিল সেসব শহরের বিভিন্ন মানুষের প্রতিও। এক শহর থেকে অন্য শহরের যাওয়ার সময় পথিমধ্যে যে শহর ছেড়ে যেতাম, সে শহরের সাথে কাটানো স্মৃতিগুলো এবং সে শহরের মানুষের সাথে কাটানো মুহুর্তগুলো আমার কল্পনায় ভেসে উঠতো। আর সেস্মৃতিগুলো কল্পনা করতে করতে আমি গাড়ির মধ্যে আবেগী হয়ে পরতাম।

আহা! কি মানুষ, একেক জায়গায় একক রকম মানুষের জীবনধারণ। জীবনধারণের মধ্যে হাজারো বৈচিত্র্য আমি লক্ষ্য করতাম। বৈচিত্র্য লক্ষ্য করতাম তাদের ভাষার মধ্যে, বৈচিত্র্য লক্ষ্য করতাম সংস্কৃতির মধ্যে, বৈচিত্র্য ছিল বিভিন্ন জায়গার খাবারের মধ্যে, একেক জায়গা বিখ্যাত ছিল একেক কারনে। আর আমি সত্যি বলতে এসব খুবই উপভোগ করতাম। নতুন মানুষদের সাথে মিশতে, তাদের সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতি মেনে আপন করে নিতে এক অন্যরকম অনুভূতি আমার মধ্যে কাজ করত। যদি প্রথম অবস্থায় একস্থান থেকে অন্য স্থানে যখন যেতাম তখন যে স্থান ছেড়ে আসতাম সেখানকার মানুষ এবং সেখানকার স্মৃতিগুলো আমাকে বেশকয়দিন খুবই ভাবাতো পাশাপাশি নতুন জায়গায় ভাষার ভিন্নতা দেখে আমি অবাক হতাম এমনকি মাঝে মাঝে সেসব আঞ্চলিক কথা বুঝতে না পেরে জনসম্মুখে হেসেই ফেলতাম।

অবশ্য সময় যাওয়ার পাশাপাশি আমিও তাদের একজন হয়ে যেতাম, ভুলেই যেতাম যে আমার আগমন অন্য এক জায়গা থেকে। মিশে যেতাম তাদের সংস্কৃতিতে, তাদের ভাষায় এবং সেসব মানুষদের সাথে এবং আমার মনে হতো ওরাই আমার আপন, ওদের সাথে আমার পরিচয় হয়তো যুগযুগ ধরে। ছুটে চললাম আমার সমবয়সী সেসব শিশুদের সাথে, এক মায়াবী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যেতাম তাদের সাথে। সেসময় অনেক কিছুই অজানা ছিল, যেহেতু অনেক কিছুই অজানা ছিল তাই মনের মধ্যে এত ভয়ডরও কাজ করত না।

এইতো তখনকার সময়ের একটা ঘটনা, আমি একজানায় অংশ নিয়েছিলাম। আর জানাযা শেষে সেখানকার আমার একবন্ধু আমাকে বলল, "চল কবস্থানে যাই।" তখন কবরস্থান কি তা আমি জানতাম না। বন্ধুর বলাতে তার সাথে গল্প করতে করতে মানুষের পদচিহ্ন অনুসরণ করতে করতে সে লাশবাহী চৌকি পিছু পিছু কবরস্থানে গিয়ে পৌছলাম। এদিকে বাবা অফিস থেকে বাসায় ফিরে আমাকে না পেয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন। ঘন্টা খানেক পর যখন বাসায় ফিরলাম বাবা একটাই প্রশ্ন করল, " তুমি কি এখানকার স্থানীয় যে হারিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া যাবে? " আমি কিছুটা অবাক হয়ে প্রতি উত্তরে বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, " স্থানীয় মানে কি বাবা? "

আমরা যতই বেড়ে উঠতে থাকি, আমরা আমাদের আশেপাশের মানুষ থেকে পাশাপাশি আশেপাশের পরিবেশ থেকে নতুন নতুন জিনিস জানতে পারছি, নতুন নতুন জিনিসের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটছে, তার এসব জিনিসই আমাদেরকে ভয়ডরহীনভাবে চলতে এবং ভয়ডরহীনভাবে ভাবতে আমাদের বাধা দিচ্ছে, আমাদের শৈশবের স্বাধীনসত্ত্বাকে আমাদের থেকে কেড়ে নিচ্ছে। নিজের সেভালো লাগা বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে গেলেও হাজারও ভয় মনের মধ্যে কাজ করে। পড়ে যাই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আমাকে দ্বারা কি হবে নাকি না?! কাজ শুরুর পূর্বের এ দুশ্চিন্তা আমাদের মাথায় এসে ভর করে। আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে, আমাদের ভালোলাগার জায়গা নিয়ে কাজ করতে। তখন একটু প্রশান্তির প্রয়োজন, প্রয়োজন একটু নীরবতার, পাশাপাশি একাকিত্ব সময়ের মাঝে প্রয়োজন নিজেকে প্রশ্নের মাধ্যমে নিজসত্ত্বাকে খুঁজে বের করে আনা এবং শৈশবের সেই ভয়ডরহীন আমিকে খুঁজে বের করে, নিজের ভালো লাগা জিনিসগুলো নিয়ে কাজ করা।



0
0
0.000
2 comments